Breaking News

করোনা শনাক্তকরণ কিট আবিস্কার দাবি! জনপ্রত্যাশা নিয়ে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের গণপ্রতারণা...

করোনা শনাক্তকরণ কিট আবিস্কার দাবি! জনপ্রত্যাশা নিয়ে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের গণপ্রতারণা...
=================================================================
সারাবিশ্বে করোনাভাইরাসের ছোবলে বাংলাদেশও সামিল হয়েছে। ইতোমধ্যে আমাদের দেশেও এই ভাইরাসজনিত একজনের মৃত্যু হয়েছে। কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া মানুষের চোখে-মুখে করোনাভাইরাস আতঙ্কের প্রতিচ্ছবি স্পষ্ট। কিন্তু ভয় আর আতঙ্কের মাঝেও গণমাধ্যমের বরাতে “কম খরচে করোনা শনাক্তের কিট আবিষ্কার করল গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র” শীর্ষক খবরটি জনমনে আশার সঞ্চার করেছে। স্বাভাবিকভাবেই দেশীয় সকল গণমাধ্যমও খবরটি যথাযথ গুরত্ব সহকারে প্রচার করে।
পত্রিকায় প্রকাশিত খবরের সুত্রে জানা যায়, এই কিট আবিস্কার নিয়ে গত ১৭ মার্চ গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র হতে সকল গণমাধ্যমে একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পাঠানো হয় যাতে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ’র বক্তব্যও উদ্ধৃত করা হয়েছে। প্রকাশিত সংবাদে জনাব জাফরউল্লাহকে উদ্ধৃত করে বলা হয় - - ওষুধ প্রশাসনের মহাপরিদপ্তরের অনুমোদনের জন্য আমরা আবেদন করেছি। অনুমতি পেলে আমরা একমাসের মধ্যেই বড় উৎপাদনে যাব। আমরা মাত্র ২০০ টাকায় জনগণকে কিটটি সরবরাহ করব।
সংবাদটিতে আরও গুরুত্বপূর্ণ যে ক’টি বিষয় জানানো হয় তা হলো:
(ক) সিঙ্গাপুর এবং গণস্বাস্থ্যের একটি গবেষক দল মিলে এ কিট আবিষ্কার করেছে। (খ) গণস্বাস্থ্যের সুদক্ষ টিম এই কিটের ডিজাইন এবং উৎপাদন করার কাজ করছে। ২০০৩ সালে সার্স ভাইরাসের ডায়াগনোসিস কিট (SARSPOC kit) তৈরীর সময় সিঙ্গাপুরে কাজ করা ড. বিজন কুমার শীল গণস্বাস্থ্যের এই টিমের অধিনায়কত্ব করছেন। (গ) এ ভাইরাসের টেস্ট কিট উৎপাদনের জন্য এ বছরের ফেব্রুয়ারি মাস থেকেই গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র কাজ শুরু করে। (ঘ) করোনার আগের রূপ SARS-COV-2 নভেম্বর ২০১৯ থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৩৮৪ বারের বেশি তার জিনের গঠন পরিবর্তন করেছে (ঙ) এই কিট তৈরীর জন্য বিএসএল টু প্লাস(BSL 2+) ল্যাব তৈরীর কাজ প্রায় শেষের দিকে। এর জন্যে রিএজেন্ট এবং ইকুইপমেন্টও যোগাড় করা হচ্ছে। ‘ডট ব্লট টেকনোলজি’ পদ্ধতিতে এই কিট তৈরির কাজ করা হবে।
সংবাদটি পড়ার পর দেশের অন্যান্য পাঠকের মতো আমার মনেও খুশির ঝিলিক বয়ে যায়। একই সাথে দাবির সত্যতা জানার জন্য মন থেকে কেমন যেন এক ধরণের তাড়া অনুভব করি। কারণ সারাবিশ্ব এ খাতে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ করলেও এখনো তেমন উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করতে সক্ষম হয়নি। শুধু চীনের একটি কোম্পানী করোনা শনাক্তে নতুন টেস্ট কিট আবিস্কার করার পর তার অনুমোদন পেয়েছেন এবং যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের দু’টি করে মোট চারটি কোম্পানী করোনা শনাক্তকরণ কিট ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের অনুমোদন পেয়েছে বলে জানা যায়। তাই এই বিষয়ে জানা-শোনা আছে এমন ক’জন ব্যক্তির সাথে যোগাযোগ করি এবং চমকপ্রদ অনেক তথ্য জানতে পারি।
গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তির সুত্র ধরে গণস্বাস্থ্যের প্রতিষ্ঠাতা শ্রদ্ধেয় ডা. জাফরুল্লাহ’র কাছে সবিনয়ে জানতে চাই:
ডা. জাফরুল্লাহ সাহেব “কোভিড-১৯” এর কিট আবিস্কার করার ঘোষণা দিয়েছেন এবং বলছেন যে তিনি ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর অনুমোদন দিচ্ছে না! শুধু তাই নয়, তিনি বলেছেন যে -
১) বাংলাদেশে সর্বপ্রথম করোনাভাইরাস সনাক্ত হয় গত ৮ মার্চ। তাহলে ফেব্রুয়ারি হতে গবেষণার জন্য আপনার বিজ্ঞানীরা করোনাভাইরাসের স্যাম্পল কোথায় পেলেন?
২) গণমাধ্যমে ১৭ মার্চ পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আপনাকে উদ্ধৃত করে উল্লেখ করা হয় - - ওষুধ প্রশাসনের মহাপরিদপ্তরের অনুমোদনের জন্য গণস্বাস্থ্য আবেদন করেছে। কিন্তু আমি নিশ্চিত হয়ে বলছি - - “COVID-19 Dot Bolt Immunoassay কিট তৈরী এবং বিপনন অনুমোদন প্রসঙ্গে” শীর্ষক বিষয় উল্লেখ করে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের স্বাক্ষরে ১৮ মার্চ ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবর আপনারা আবেদন করেছেন। আপনার বক্তব্য অনুযায়ী সেই আবেদন এট লিস্ট ১৭ মার্চ হওয়ার কথা কিন্তু আবেদন করেছেন ১৮ মার্চ। উল্টোরথে সঠিক পথে হাঁটার মতো অবস্থা বৈকি!
৩) গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে যে, SARS-COV-2 নভেম্বর ২০১৯ থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৩৮৪ বারের বেশি তার জিনের গঠন পরিবর্তন করেছে। তাহলে স্বাভাবিকভাবেই বলা যায়, এই ভাইরাসের জিনোম সিকোয়েন্স পুরোপুরি বুঝতে পারা অনেক কষ্টসাধ্য বিষয়। তাছাড়া SARS-COV-1 ভাইরাসের সাথে নতুন করোনাভাইরাসের সাদৃশ্য নেই। গণস্বাস্থ্যের টিম লিডার SARS-COV-1 ভাইরাসের ডায়াগনোসিস কিট তৈরীর সময় সিঙ্গাপুরে কাজ করেছেন। এর মানে তিনি SARS-COV-2 ভাইরাসের শনাক্তকরণ কিট তৈরিতেও সক্ষম হবেন তার নিশ্চয়তা বহন করে না। অভিজ্ঞতার আলোকে হয়তো তিনি এগিয়ে থাকবেন।
৪) গণস্বাস্থ্যের প্রেস রিলিজেই উল্লেখ করেছেন - - ডট ব্লট টেকনোলজিতে কিট তৈরির জন্য রিএজেন্ট এবং ইকুইপমেন্টও যোগাড়ের পাশাপাশি বিএসএল টু প্লাস(BSL 2+) ল্যাব তৈরীর কাজ প্রায় শেষের দিকে। কিট তৈরির ল্যাব রেডি নেই, নেই রিএজেন্ট এবং ইকুইপমেন্টও। অথচ ঘোষণা দিয়ে দিলেন - - করোনা পরীক্ষার কিট আবিস্কার করেছে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র! কেমন যেন ডাবল স্ট্যান্ডার্ড বার্তা হলো না?
যে কোন নতুন কিটের অনুমোদন দিতে গেলে আবিস্কারক/আবিস্কার দাবি করা প্রতিষ্ঠানকে কোন মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন করতে হলে বা মার্কেটিং অথোরাইজেশন নিতে হলে সব রেগুলেটরি অথরিটি প্রটোকল অর্থাৎ স্টাডি ডকুমেন্ট চায়। প্রটোকলে Objectives, Design, Methodology, Statistical Consideration ও Organisation of a Trial ইত্যাদি বর্ণিত থাকে। অথচ গণস্বাস্থ্যের আবেদনে এ ধরণের কোন সংযুক্তি দেওয়া হয়নি। এমনকি গণস্বাস্থ্যের আবেদনে কোথাও টেকনিক্যাল কোন কথাবার্তা বলা নেই।
মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন করার জন্য বা মার্কেটিং অথোরাইজেশন নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে ক্লিনিকাল ট্রায়ালের আগে প্রি-ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল করতে হয়। প্রি-ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে উৎপাদিত ডিভাইসের প্রয়োগ ঘটাতে হয় প্রাণীর উপর। এরপর আসে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের ফেজ-১, যা সম্পন্ন করা হয় কিছু সংখ্যক স্বাস্থ্যবান মানুষের উপর। এর মাধ্যমে সেই ডিভাইসের সেফটি তথা সম্ভাব্য পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করা হয়। এরপরে ফেজ -২ সম্পন্ন করা হয় বেশি সংখ্যক মানুষের উপর। এতে সেই ডিভাইসের ডোজেজ স্ট্রেন্থ (Strength) দেখা হয় বা ঠিক করা হয় (যেমন নাপা ৫০০মি.গ্রা. বা ৬৫০মি. গ্রা.)। আর সর্বশেষ তৃতীয় ফেজ-৩ সম্পন্ন করতে হয় কয়েকশ হতে কয়েক হাজার ব্যক্তির উপর। এর মাধ্যমে ভিভাইসের কার্যকারিতা, উপকারিতা ও বিদ্যমান (যদি থেকে থাকে) অন্যান্য ভিভাইসের সাথে এই ভিভাইসের সম্ভাব্য তুলনামূলক বিরূপ প্রতিক্রিয়া ইত্যাদি। এ সকল প্রি-ট্রায়াল ও ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল সফলভাবে শেষ হলে ও প্রত্যাশিত ফলাফল পাওয়া গেলেই তবে নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের নিকট নতুন ভিভাইসের মাস প্রোডাকশন ও বিপণনের অনুমোদন দিয়ে থাকে।
গণস্বাস্থ্য কোন ধরণের প্রক্রিয়া না মেনেই কিট উৎপাদন ও বিপণনের আবেদন করেছে। শুধু তাই নয়, দাম পর্যন্ত ঘোষণা করেছে। সেটা কিভাবে সম্ভব তা আমার বোধগম্য নয়।
নিউজটা কয়েকবার মনোযোগ দিয়ে পড়লে বুঝা যায় যে, গণস্বাস্থ্য কিংবা ডা. জাফরুল্লাহ ঘোষিত টিম মিডিয়ার মাধ্যমে অস্তিত্বহীন করোনা শনাক্তকরণ কিট আবিস্কারের ঘোষণা দিয়েতেল। তাহলে কি গণস্বাস্থ্য কিংবা ডা. জাফরুল্লাহ “কোভিড-১৯” মহামারির এই সময়ে জনগণের অসহায়ত্বের সুযোগ নিচ্ছেন নাকি গণস্বাস্থ্য জনগণের সাথে গণপ্রতারণা করছে? সময়ে হয়তো সকল প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে। তবে এটা নির্দ্ধিধায় বলা যায় - - এই ঘোষণার উদ্দেশ্য মহৎ নয়। কারণ, এই ঘোষণা বিয়ের পরিকল্পনা করতে থাকা কোন ব্যক্তি কর্তৃক সন্তানের আকিকা দেয়ার মতো ঘটনা। বিয়েই হলো না অথচ বাচ্চার আকিকা! বাচ্চা যে হবে তার গ্যারান্টি কি? আর বাচ্চা হলেও সেটা জীবিত না মৃত হবে সেটাই বা কে বলতে পারে?
জীবনের শেষ প্রান্তে মানুষ নিজের যাপিত জীবনের ভুল-ত্রুটির জন্য অনুতাপ করে আর সেজন্য প্রকাশ্যে ক্ষমা না চাইলেও নিজের কাছেই নিজেই লজ্জিত বোধ করেন। জনাব জাফরুল্লাহ সাহেব, আপনি মুরব্বি মানুষ। আপনি জীবনের শেষ প্রান্তে এসে করোনাভাইরাসের মত ভয়ংকর জীবাণু নিয়ে আপনার ঘাতক-খেলা বন্ধ করুন। না হয় তলানিতে থাকা আপনার সম্মানের আরও অধ:পতন বৈ কিচ্ছু হবে না।
আর গণমাধ্যমের বন্ধুদের কাছে অনুরোধ- - গুরুত্বের সহিত যাচাই-বাছাই সাপেক্ষে এ ধরণের নিউজগুলো প্রচার করলে দেশ ও জনগণের কল্যাণ হবে। আপনার গণস্বাস্থ্য কিংবা ঘোষণা দেয়া সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গকে উপরোক্ত প্রশ্নগুলো করুন। তবেই জাতি জানতে পারবে যে আসলে ওনারা আদৌ কিছু করেছেন কিনা?
করোনাভাইরাসের বিস্তার ও প্রাদুর্ভাবের এই সময়ে সবাই সচেতন থাকি। নিজে নিরাপদ থেকে অন্যকেও নিরাপদ রাখতে সহযোগিতা করি। জয় বাংলা।

No comments