Breaking News

যে কারণে কাজলেরা কথা শুনছে না

গত দুই সপ্তাহ ধরে কাজল রেডিও, টেলিভিশন, সংবাদপত্র এবং ফেসবুকে করোনাভাইরাস নিয়ে অসংখ্য কন্টেন্ট শুনেছে, দেখেছে এবং পড়ছে। এসবের মধ্যে করোনা প্রতিরোধে করণীয় যেমন, নিয়মিত হাত ধোয়া, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকা, মাস্ক পরা, ঘর থেকে বের না হওয়া, জনসমাগম পরিহার করা, ভ্রমণ না, ভদ্রলোকের মত হাঁচা, সুশীলের মত কাশা ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। একটা বিষয় নিয়ে এতো ছবি, এতো ভিডিও, এতো কন্টেন্ট কাজল জীবনেও দেখেনি। চোখের সামনে কোনো কন্টেন্ট এসেছে আর কাজল সেটা অন্তত একবারের জন্য হলেও পড়েনি বা দেখেনি এমনটি হয়নি। চিন্তার বিষয় হচ্ছে, কাজল এসব নিয়মের তোয়াক্কাই করছেনা। তার ধারণা, করোনা-ফরোনা কিছুই করতে পারবেনা। নিয়ম জেনেও নিয়ম না মানার বিষয়টি খুব সাঙ্ঘাতিক!
এই সাঙ্ঘাতিকটা সাঙ্ঘাতিকতর হয়ে যায় যখন এই গল্পের কাজলের মত আরও অসংখ্য কাজল নিয়ম মানছেনা, কথা শুনছেনা। কলেজ পাশের নলেজ নিয়েও তারা করোনাভাইরাস দেখতে যাচ্ছে। বাসে, ট্রেনে, লঞ্চে গাদা-গাদি করে ঘরে ফিরছে। অথচ তারা কম-বেশি সবাই জানে দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণের মাশুল কত সাঙ্ঘাতিক হতে পারে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কাজলেরা কথা শুনছে না কেন? এ প্রশ্নের জনপ্রিয় উত্তরগুলো হচ্ছে এরকম-বাঙ্গালী অশিক্ষিত, বাঙ্গালী কাশতে জানেনা-হাঁচতে জানেনা, নিজের ভালটা বুঝেনা, এরা আদিম, অসভ্য, বর্বর, উজবুক। এককথায় বলা যায় বাঙ্গালী এখনও মানুষ হতে পারেনি। এখন আমি যদি মানুষই না হয় তবে কথা শুনবো কীভাবে, বুঝবো কীভাবে আবার সে কথা মানবো কীভাবে?
আমার একটা নাম যেহেতু কাজল এবং আমি সেই উজবুকদের একজন, সেহেতু আমি বাঙ্গালী’র ‘কথা না শোনার’ কারণ অনুসন্ধান শুরু করলাম। বলতে পারেন গবেষণার আগুনে ঝাঁপ দিলাম। যা পেলাম সেটাকে সাঙ্ঘাতিকতম বললেও কম হবে। অনেক কারণের মধ্যে প্রধানতম কারণগুলো আলোচনা করতে চাই। আপনার কাছে পুরো বিষয়টি উজবুকীয় মনে হতে পারে। যাই হোক, সংক্ষেপে কয়েকটি পয়েন্ট আলোচনা করিঃ
ক) গল্প বলাটা হচ্ছেনাঃ
স্টোরি টেইলিং বা গল্প বলার একটা গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে, “আপনি কী বলছেন সেটা যেমন জরুরি, তার চেয়ে বেশি জরুরি আপনি কীভাবে সেটা বলছেন”। আপনি আমাকে ইমোশনালি কানেক্ট করতে না পারলে কোনো লাভ নাই। আপনার গল্পে এমন কিছু নাই যেটার কারণে আমি সেটা মনে রাখবো এবং মেনে চলবো। অনেকেই গান করেন সবারটা কি গান হয়? বেশিরভাগেরটা নয়েজ হয়ে যায়। আপনার শব্দভাণ্ডারে যেসব শব্দ আছে সেগুলো ভোঁতা হয়ে গেছে। আমার মনে দাগ কাটছেনা। বিষয়টা অনেকটা সিগারেটের প্যাকেটে “ধূমপান মৃত্যুর কারণ” লিখে রাখার মত। সব ধূমপায়ী এটা জানে কিন্তু কেউ মানেনা।
কীভাবে বলা হলে মানুষ শুনবে সে ফরমুলা ২০০০ বছর আগে এরিস্টটল সাহেব দিয়ে গেছেন। তিনি বলেছেন মানুষকে প্রভাবিত করতে চাইলে আপনার ম্যাসেজ/ কন্টেন্টের মধ্যে 10% Ethos ( আপনার বিশ্বাসযোগ্যতা), 25% Logos (যুক্তি, জ্ঞান, তথ্য ইত্যাদি) এবং 65% Pathos ( ইমোশন, ইমপ্যাথি) থাকা লাগবে। এই ফরমুলা দিয়ে গল্প বলে Steve Jobs রাজত্ব করেছিলেন। আপনি চাইলে এ সূত্র ব্যবহার করে মশার কয়েলও বিক্রি করতে পারেন। বিস্তারিত অন্য একদিন। আগ্রহীরা ইন্টারনেট থেকে দেখে নিতে পারেন।
খ) বিশ্বাস ও আস্থাঃ
যিনি করোনাভাইরাসের আপডেট দিচ্ছেন, নিয়ম কানুন শেখাচ্ছেন তার উপর কাজলেরা আস্থা রাখতে পারছেনা বা তাকে বিশ্বাস করতে পারছেনা। নেতা, সেলিব্রিটি, সুশীল বা বুদ্ধিবৃত্তিক সংস্থার কর্মী যার কথায় বলুন না কেন, আমরা তাদের অনেক কথা, প্রতিশ্রুতি শুনেছি কিন্তু তারা কথা রাখেননি। তারা বারবার আমাদের হতাশ করেছেন, আমাদের বিশ্বাস ভঙ্গ করেছেন। যাকে আমি বিশ্বাস করিনা তার কথা শুনবো কীভাবে?
ধরা যাক আমি একজন ড্রাইভার। আমি বিরাট এক নায়কের গাড়ি চালাই। আমার সেই নায়ক বস একটি পেস্টের বিজ্ঞাপনের মডেল। এই বিজ্ঞাপন দেখে আমার বাবা-মায়ের অনেক গর্ব হয়। তাদের ছেলে এই নায়কের সাথে থাকে। তারা সাথে সাথে পুরাতন পেস্ট ( যদি নতুন কেনা হয়েছিল) ফেলে এই ব্র্যান্ডের পেস্ট কিনে ব্যবহার শুরু করে। আসল কাহিনী হচ্ছে আমার বস বাংলাদেশের কোনো পেস্টই ব্যাবহার করেন না। এখন সেই বস যদি আমাকে করোনা নিয়ে কিছু বলে তখন কিন্তু আমি তাকে পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারিনা। একজন মন্ত্রী সবাইকে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে বলছেন আবার নিজে গাদাগাদি করে সংবাদ সম্মেলন করছেন। অন্য দায়িত্বশীলদের কথা না হয় না বলি।
সবচেয়ে বড় কথা, কার কন্টেন্ট বা ম্যাসেজ আমি বিশ্বাস করবো? এতো বিজ্ঞানী, এতো ডাক্তার, এতো বিশেষজ্ঞ এতদিন কোথায় ছিলেন?
বিশ্বাসের বিষয়টি অন্যভাবেও দেখা যায়। আমাদের অনেকেই ধরেই নিচ্ছে তাদের কিছু হবেনা। উপরে একজন আছেন তিনি আমাদের রক্ষা করবেন। তাই আমরা যেকোনো উপায়ে গ্রামের বাড়ি যেতে চাই। আমরা জানি মায়ের কাছে বা বাবার কাছে যেতে পারলেই হবে। মা একবার মাথায় হাত রাখলেই চলবে। মনে রাখতে হবে এই ভূখণ্ডে একসময় সহমরণ প্রথা চালু ছিল। সবাই একসাথে মরতে চাই আমরা। কী সুইট!
গ) জ্ঞানভিত্তিক সমাজঃ
আমরা জ্ঞানভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু আমার দৃষ্টিতে জ্ঞানভিত্তিক সমাজের কিছু অসুবিধা আছে। খুলেই বলি। জ্ঞান যখন একজায়গাতে জমা থাকবে, যেকেউ যেকোনো সময় সেই জ্ঞান সংগ্রহ করতে পারবে তখন অন্যদের প্রতি নির্ভরশীলতা কমে যাবে। নির্ভরশীলতা কমে গেলে মিথস্ক্রিয়া কমে যাবে। এরফলে অন্যকে যেমন সম্মান করতে ইচ্ছে করবেনা তেমনি নিজেকে সবচেয়ে জ্ঞানী বলে মনে হবে।
আজ থেকে ২/৩ দশক আগে কারো শরীরের কোনো অংশ কেটে গেলে সে কোনো এক মুরুব্বিকে বলত, “চাচা আমার হাত বা পা কেটে গেছে। আমি কী করবো?” চাচা দূর্বা-ঘাস চিবিয়ে কাটা জায়গায় লাগিয়ে দিতে বলতেন। চাচার জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতার কারণে আমরা চাচাকে সম্মান করি। কখনও বলিনা করিম সাহেব কেমন আছেন। কিন্তু তথাকথিত উন্নত দেশে চাচাদের দরকার নাই। জ্ঞান হয় পাঠাগারে না হয় ইন্টারনেটে জমা থাকে। কিছু জানার জন্য কোনো মানুষের কাছে যেতে হয়না কাজেই একজন বাপের বয়সী মানুষকে তারা নাম ধরে ডাকতে পারে। অল্পদিন পরেই হয়তো আমাদের দেশেও এমন সংস্কৃতি চালু হবে। আমার এ ধারণাটা ভুল হলেই আমি খুশি।
এখানে সবাই জ্ঞানী। কেউ কারো চেয়ে কম না। একজন চীনের খবর জানেতো আরেকজন ইতালির সর্বশেষ খবর জানে। একেকজন একেক বিষয়ে অভিজ্ঞ। আর গুজব, ট্রোল কীভাবে সামলাতে হয় সেটি আমাদের জ্ঞানের বাইরে। তাহলে বলুন আমরা কোনটা শুনবো? কারটা শুনবো?
অতিরিক্ত কন্টেন্টের কারণে বদহজম হচ্ছে কিন্তু।
আরও অসংখ্য কারণ আছে যেগুলো বলতে গেলে শেষ হবেনা। তাই শেষ করছি। অনুরোধ করছি, কাজলদের গালিগালাজ না করে সেই সময়টা একটু ভাবুন কীভাবে বললে তারা শুনবে। আমরা যে তলে তলে সবাই বক্তা হয়ে গেছি এটা ভুলে গেলে চলবেনা। কেউ আর শ্রোতা হিসেবে থাকতে চাইনা আমরা। কাজলেরা কেন কথা শুনেনা এবার নিশ্চয় বুঝতে পেরেছেন।
এই মুহূর্তে আমাদের দরকার উন্নয়ন যোগাযোগ (Developemnt Communication) উদ্যোগ। পণ্য বিপণন কৌশল আর করোনা বিষয়ক যোগাযোগ এক না। এখানে শুধু সচেতনতা দিয়ে কাজ হয়না। মানুষের আচরণ পরিবর্তন করতে পারে এমন যোগাযোগ (Behavioural Change Communication-BCC) নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে। এটা কি সবার কাজ?
কমিউনিকেশন নিয়ে Naimuzzaman Mukta ভাইয়ের একটা কিংবদন্তি থিউরি দিয়ে শেষ করতে চাই। মুক্তা ভাই বলেন, “টেবিলের উপর একটা এক্সরে ফিল্ম রাখা হলে সবাই একসাথে ঝাঁপিয়ে পড়ে। গভীর মনোযোগে দেখতে থাকে এবং মন্তব্য করতে থাকে। অথচ এরা না ডাক্তার, না নার্স। এমনকি তারা ডাক্তারি বিদ্যার শিক্ষার্থীও না। কমিউনিকেশন বিষয়টাকেও আমরা এক্সরে ফিল্ম এর মত খুব সহজ করে ফেলেছি। এটা সবাই বুঝি।”
কথা দিচ্ছি এখন থেকে আমরা অর্থাৎ কাজলেরা মানুষ হতে চেষ্টা করবো। দায়িত্বশীল হবো এবং এক সাথে কাজ করে দেশকে করোনামুক্তা করেই ছাড়বো ইনশাল্লাহ।
লেখাটি Hasan Benaul Islam স্যারের ফেসবুক ওয়াল থেকে নেয়।

No comments