Breaking News

সততার গায়; হাতুড়ির ঘায়


এস.এম আরিফুজ্জামানঃ গত বৃহস্পতিবার ভোররাতে দুর্বৃত্তদের হামলায় দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সরকারি বাসভবনে ইউএনও ওয়াহিদা খানম ও তার বাবা বীরমুক্তিযোদ্ধা ওমর আলী আহত হয়েছেন। বর্তমানে তিনি ঢাকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্স হাসপাতালের নিউরো ট্রমা বিভাগের প্রধান নিউরো সার্জন ও তার চিকিৎসার জন্য গঠিত মেডিকেল বোর্ডের প্রধান ডাক্তার মোহাম্মদ জাহিদ হাসানের তত্ববধায়নে চিকিৎসাধীন আছেন। বৃহস্পতিবার রাতে তার মাথার ভাঙ্গা হাড়ের সাত আট টুকরা অস্ত্রোপচারে জোড়া লাগিয়েছেন চিকিৎসকগণ। তাকে ৭২ ঘন্টার পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। আশা করা হচ্ছে তিনি অচিরেই শংকামুক্ত হবেন। তিনি জ্ঞাণ ফিরে পেয়েছেন এবং কথা বলতে পারছেন তবে ব্রেনের মধ্যে হাড় ঢুকে যাওয়ায় শরীরের যে অংশ অবশ হয়ে গিয়েছিল তার কোন উন্নতি হয়নি। তবে এ ব্যাপারেও আশাবাদি চিকিৎসকগণ। এই টুকুতেই আশাবাদি আমরাও অনেকেই। কারণ আমাদের অনুভূতি ঠুনকো। যত দ্রুত প্রসারিত হয় তার দ্বিগুন গতিতে আবার সংকুচিত হয়ে যায়। এই ঘটনা নিয়ে ফেসবুক এখন ভেসে যাচ্ছে সময়ের পরিক্রমায় হয়ত দু’দিন বাদেই স্মৃতির অতলে বিস্মৃত হবে অন্য কোন ঘটনার আড়ালে। তবে এ ঘটনায় দুটো প্রশ্ন মনে ঘুরপাক খাচ্ছে। একজন সরকারি কর্মকর্তা রাত দুপুরে নিজের সরকারি বাড়িতে বর্বরোচিত হামলার শিকার হলেন তার কি অপরাধ ছিলো? এ ঘটনায় আটকরা নাকি চুরি করতে গিয়েছিলো? 

স্থানীয় লোকজনের ধারণা, শুধু চুরির উদ্দেশ্য থেকে এই হামলার ঘটনা ঘটেনি। তিনি ন্যায়ে অবিচল থেকে ঘোড়া ডিঙ্গিয়ে ঘাট পার হতে গিয়েছিলেন এটাই হয়ত: তার অপরাধ। ঘটনায় জড়িত অভিযোগে যাদের আটক ও গ্রেপ্তার করা হয়, তাদের মধ্যে নৈশ প্রহরী নাহিদ হোসেন পলাশ, রংমিস্ত্রি নবিরুল ও সান্টু ছাড়া বাকি সবার নামে ঘোড়াঘাট থানায় রয়েছে একাধিক মাদক, চাঁদাবাজি ও জমি দখলের মামলা রয়েছে। তাদের নেতৃত্বে ঘোড়াঘাটে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছিল ছিনতাই ও জমি দখলের কার্যক্রম। উপজেলাজুড়ে মাদক কারবারেও জড়িত তারা। করোনাকালে ত্রাণ চুরি, জমি কেনাবেচায় চাঁদা আদায়, অবৈধভাবে বালু উত্তোলন এবং সংসদ সদস্যের ওপর হামলার চেষ্টাসহ নানা অপকর্মের অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। গত ১২ মে দিনাজপুর-৬ আসনের সংসদ সদস্য নিজ তহবিল থেকে ঘোড়াঘাট পৌরসভার মেয়র আব্দুস সাত্তার মিলনের মাধ্যমে ইফতার সামগ্রী বিতরণের উদ্যোগ নেন। সেই ইফতারসামগ্রী ও ত্রাণ ছিনিয়ে নিয়ে মেয়র মিলনের পাঞ্জাবি ছেঁড়াসহ তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়। এ ঘটনার মামলায় সম্প্রতি বহিস্কৃত জাহাঙ্গীর ও তার সহযোগী মাসুদ রানা, ইয়াদ আলী, নাহিদ, আব্দুর রবকে আসামি করা হয়েছে। সে সময় উপজেলা নির্বাহী অফিসার ওয়াহিদা খানম পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ঘোড়াঘাট রানীগঞ্জ বাজার এলাকায় নুনদহ ঘাটে অবৈধভাবে শ্যালো মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলন করছিলেন মাসুদ রানা। ইউএনও ওয়াহিদা খানম সেখানে বালু উত্তোলনের সরঞ্জাম পুড়িয়ে দিয়েছিলেন। 

গত ১৪ মে প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধা সায়েদ আলীর জামাতা আবিদুর রহমান যুবলীগ দিনাজপুর জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক বরাবর চাঁদার দাবিতে জমি দখল করার অভিযোগ করেন। অভিযোগটি ইউএনওর কাছেও আসে। অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, জাহাঙ্গীর আলম ও মাসুদ রানা দীর্ঘ দুই বছর ধরে তার কাছে পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে আসছিল। বিভিন্ন সময় তাদের দুই লাখ টাকা দেওয়া হয়। বাকি টাকা দিতে বিলম্ব হলে তারা কলোনিপাড়া এলাকায় তাদের এক একর জমি দখল করে নেয়। ওয়াহিদা খানম বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে জমি উদ্ধারের চেষ্টা চালাচ্ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, জাহাঙ্গীর, আসাদুল ও মাসুদ প্রায় সময় উপজেলার বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে জমি কেনাবেচার সময় চাঁদা দাবি করতেন। চাঁদার টাকা দিতে অস্বীকার করলে তাদের বাহিনী দিয়ে সেই জমি জবরদখল করতেন। এই বাহিনীর প্রধান অর্থদাতা হিসেবে ছিলেন মাসুদ রানা। এলাকাবাসি জানান, জাহাঙ্গীর আলম একজন মাদক কারবারি হিসেবেও এলাকায় পরিচিত। পুরো উপজেলায় তিনি মাদক ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার জন্য রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করতেন। তার নেতৃত্বে নান্নু, মাসুদ রানা, ইয়াদ আলী, নাহিদ, আব্দুর রব, নবিউল ইসলামসহ বেশ কয়েকজন যুবককে নিয়ে একটি বাহিনী সক্রিয়। প্রায় এক মাস আগে পাশের হাকিমপুর উপজেলায় মাদক নিতে এসে পুলিশের হাতে আটক হন জাহাঙ্গীর। সেই আটকের ভিডিও সে সময় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়। একজন জনপ্রতিনিধি তাদের পৃষ্ঠপোষকতা করেন বলে সর্বত্র গুঞ্জণ। 

অথচ সে সব বাদ দিয়ে স্বীকারোক্তি আসলো চুরির। চুরি করতেই যদি যাবে তবে তাদের আঘাত করে অচেতন করে কিছু না নিয়েই কেন ফিরে গেলো? চুরি না করেও যদি নিয়ত করার করানে এটা চুরির মামলা হয় তবে হত্যা করার উদ্দেশ্য করে আঘাত করার পরও এটি হত্যা মামলা নয় কেন ? রাজনীতির মধ্যে পলিটিক্স ঢুকে কি যে এক্টা অবস্থা তা তৃণমূলে যারা বসবাস করেন তারা জানেন। প্রায় জায়গায়ই এখন জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন পর্যায়ের জনপ্রতিনিধিগণ সরকারি দলে থেকেও নানা মুনি নানা মতে বিভক্ত। সেই সব বিপরীতমুখি স্রোতের মোহনায় থাকেন মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাগণ। সভা, সমাবেশ, দিবস উদযাপন, প্রকল্প বাস্তবায়ন, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর সুবিধাভোগী নির্বাচন, উন্নয়নসহ নানা কাজে এখন তাদের ভূমিকা প্রায় স্বাক্ষী গোপালের মত। অথচ সব দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহিতা তাদেরই। এ সব নিয়ে বিড়ম্বনায় পড়তে হয় তাদের। বিশেষ করে যারা সৎ কর্মকর্তা। ম্যানেজ আর আপোষ প্রক্রিয়ায় অনেকেই চালিয়ে যেতে পারলেও যাদের শিরদাঁড়া আছে তারা অন্যায়ের সাথে আপোষ করেন না কিন্তু হাল জামানায় সৎ থাকার মতো কষ্ট দ্বিতীয়টি আর নেই। সৎ মানুষের বন্ধু কম, সহযোগি কম কিন্তু বিরোধিতা করার মানুষের অভাব হয় না। তখন তারা কতটা যন্ত্রণাক্লিষ্ট থাকেন তা শুধু ভূক্তভোগী মাত্রই জানেন।

এ বিষয়ে দু একটি ঘটনা উল্লেখ করতে চাই, যশোরের একজন জেলা প্রশাসক চেয়েছিলেন সরকারি অর্থের অপচয় তিনি রোধ করবেন। পাশাপাশি প্রকল্পের কাজের বাস্তবায়ন নিশ্চিত করবেন। তিনি জুন ক্লোজিংয়ের এক দুই দিন আগে দাখিল করা প্রকল্প অনুমোদন দেয়া বন্ধ করে দিলেন। সারা বছর যারা কাজ করেনি দু’তিনদিনে তারা কি কাজ করবে এ ভাবনা থেকে। তার এ উদ্যোগ প্রশংসিত হবার বদলে চরম ঝুকিঁতে পড়েছিলো। স্থানীয় প্রভাব বলয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট কাজের উর্দ্ধতন কৃর্তপক্ষের কাছে তাকে হেনস্তা হতে হয়েছিল। যশোরেরে একজন ইউএনও করোনাকালে নানা উদ্যোগ নিয়েছিলেন তার মধ্যে অন্যতম ছিলো স্থানীয় তরুণদের নিয়ে একেবারে গ্রাম ভিত্তিক স্বেচ্ছাসেবি দল গঠন। তাদের মাধ্যমে প্রকৃত দুস্থদের তালিকা তৈরী, সহায়তা প্রদান, করোনায় সচেতনতা তৈরীসহ নানা প্রশংসনীয় উদ্যোগ নিয়ে চলেছিলেন তিনি। মাস তিন চার চলার পর সুযোগসন্ধানীদের চক্ষুশূল হলেন।  করে কম্মে খেতে না পেরে রটিয়ে দেয়া হলো তিনি সরকার বিরোধীদের সুসংগঠিত করছেন। ব্যাস প্রশংসার বদলে জুটলো দুয়োধ্বনি। যশোরের এক উপজেলা সহকারি কমিশনার (ভূমি) চেয়েছিলেন তার অফিস দালালমুক্ত করবেন। শুরু করলেন শতভাগ অনলাইন ই নামজারিসহ ডিজিটাল ভূমি সেবা। অফিসের কর্মচারিরা একাট্টা হয়ে বিভাগীয় কমিশনার মহোদয়ের কাছে গণ নালিশ দিলেন অনৈতিক অর্থ আদায়ের। সেটাতে যুত করতে না পেরে এক নারী কর্মচারি যার বিরুদ্ধে অপকর্মের বিস্তর পূর্ব অভিযোগ ছিলো তিনি সেই কর্মকর্তার নামে অভিযোগ করলেন চরিত্রগত দিক উল্লেখ করে নানা অসত্য অপপ্রচারে। তাতেও ধোপে টিকতে না পেরে নিজেরা চাঁদা তুলে তাকে বদলীর জন্য উপর মহলে তদবির করেছিলেন এটা বলে এই কর্মকর্তার নিজ জেলা আর বিরোধীদলের শীর্ষ এক নেতার নিজ জেলা একই। তাই এই কর্মকর্তা সরকারি বিরোধী। এ রকম হাজারো অদ্ভুত অভিযোগ ওঠে সৎ কর্মকর্তাদের নামে। বরিশালের এক ইউএনওর হাতে হাতকড়া পরিয়ে আদালতে তোলার ঘটনা অনেকে ভুলতে বসেছি। তার অপরাধ ছিলো শিশুদের মাঝে তিনি বঙ্গবন্ধুর চেতনা ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন। কপালে জুটেছিলো মানহানি মামলা। ঘটনা খুঁজতে খুঁজতে বেরিয়ে এসেছিলো এক নেতার ভাইপোকে পাবলিক পরীক্ষায় অসাধু উপায় অবলম্বনের জন্য তিনি এক্সফেলড করেছিলেন। সেটায় ঘুরতে ঘুরতে হয়েছিল মানমানি মামলা।

কিন্তু এবারের ঘটনাটা আরো বেশী অমানবিক। হামলার শিকার একজন নারী কর্মকর্তা। যিনি এসডিজি বাস্তবায়ন আর নারীর ক্ষমতায়ণ বাস্তবায়নে ভূমিকা রেখে চলেছিলেন। যিনি ৮ মার্চ নারী দিবসে প্রধান অতিথি হয়ে নারী সুরক্ষায় নানা কথা বলতেন। যিনি একটি উপজেলার মানুষের নিরাপত্তায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে উদয়াস্থ দায়িত্ব পালন করতেন আজ তার নিজের নিরাপত্তায় প্রশ্নবিদ্ধ। ওয়াহিদা খানম প্রতুৎপন্নমতি ছিলেন, নানা উদ্ভাবনী উদ্যোগে মানুষের মন জয় করেছিলেন সে জন্যই কি সেই মাথাটাই হামলার নিশানা ছিলো? চিকিৎসকগণ তার ভাঙ্গা মাথা জোড়া লাগাতে পেরেছেন কিন্তু তার ভাঙ্গা হৃদয়ের জোড়া কে লাগাবে? শিশু আদিয়াত কি জানতে পারবে রাতের আঁধারে কিছু কুলাঙ্গার কেন তার মা আর নানাকে হামলা করে রক্তাক্ত করেছিল? সততার পুরস্কার এ রকম হলে প্রশাসনের যারা জুনিয়র তারা কাদের অনুসরণ করবে? সততার পথে থাকা ওয়াহিদা খানমের গায় হাতুড়ির আঘাত কি প্রতিকি অর্থে সত্যের গায়েই আঘাতের শামিল নয়?

জজ মিয়া এপিসোডের নিউ ভার্সন মানুষ দেখতে চায় না, বিশ্বাসতো করেই না। আমার একজন প্রিয় নেতা বলেছিলেন “ আমাদের একমাত্র সুখের জায়গা আমাদের দেশে শেখ হাসিনার মতো একজন নেতা আছেন, আবার আমাদের একমাত্র দু:খের জায়গা তিনি ছাড়া আমাদের কেউ নেই”। জনস্বার্থে তিনিই বিষয়টি দেখবেন এবং অপকর্মের হোতাদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার করবেন সেটাই সবার প্রত্যাশা। আমাদের চাওয়া শুধু তার সুস্থতা নয় ন্যায় বিচারও।

No comments