Breaking News

ডিজিটাল সেবা প্রদান প্রক্রিয়ায় দুর্নীতি প্রতিরোধ ব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি


আজ আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী দিবস। নভেল করোনাভাইরাসসৃষ্ট মহামারীর কারণে রাষ্ট্রীয় ও নাগরিক জীবনের অনেক প্রক্রিয়া ও ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন এসেছে।

এ মহামারী নেতিবাচক অনেক বিষয়ের পাশাপাশি কিছু ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তনের সুযোগও তৈরি করেছে। বর্তমান সরকারের তথ্যপ্রযুক্তিতে অগ্রসরমান ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের যে প্রয়াস ছিল, অনাকাঙ্ক্ষিত হলেও সত্য যে, এ মহামারী সেই প্রয়াসের বাস্তবায়নকে ত্বরান্বিত করেছে। মানুষ মাউসের একটি ক্লিকেই এখন বড় বড় আর্থিক লেনদেন সারছে, অশিক্ষিত মানুষও মোবাইলের মাধ্যমে তার পরিশ্রমের অর্থ পাচ্ছে।

ইন্টারনেট বিক্রয়ের বিজ্ঞাপনে দেখানো হচ্ছে, নাতির মোবাইলের মাধ্যমে পাঠগ্রহণ নিশ্চিত করতে ষাটোর্ধ্ব দাদু বাঁশ দিয়ে মোবাইল স্ট্যান্ড তৈরি করছে। প্রয়োজন আমাদের আজ এ উদ্ভাবনী বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।

স্বাস্থ্যঝুঁকি বিবেচনায় প্রযুক্তির সাহায্যে ঘরে বসে কাজ করে মানুষ উৎপাদনশীলতা ও অর্থনীতির চাকা সচল রেখেছে। এ ব্যবস্থা একদিনে গড়ে না উঠলেও করোনাভাইরাসসৃষ্ট পরিস্থিতি আগামীর দশ বছরকে বর্তমান বাস্তবতায় রূপান্তর করেছে।

পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকারি সেবাদানের অনেক সেকেলে ব্যবস্থাই ডিজিটালাইজড হতে বাধ্য হচ্ছে। পাড়াগাঁয়ের প্রাথমিকের শিক্ষকও এখন তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে পাঠদান করছেন। পাটের দড়ির শিকায় মোবাইল ঝুলছে, শিক্ষিকার যত্নের রান্নাঘরটি পরিণত হয়েছে শ্রেণিকক্ষে। সরকার দেশের প্রান্তিক পর্যায়ে দরিদ্র ও অসহায় মানুষের মোবাইলে সহায়তার অর্থ পৌঁছে দিচ্ছে।

কিন্তু এতসব সম্ভাবনার পরও দেশের দুর্নীতিবাজ দানবরা থেমে নেই। সেবাপ্রদান ব্যবস্থায় প্রকৃত উপকারভোগী বা সেবাপ্রত্যাশীর কাছে পৌঁছাতে সরকার যেমন বিভিন্ন অভিনবত্ব অবলম্বন করছে, দুর্নীতিবাজরা সেখানেই ফাঁকফোকর বের করে নিজের আখের গোছানোর অপচেষ্টায় লিপ্ত। এ জন্যই প্রণোদনার অর্থ লোপাটে ২০০ উপকারভোগীর ক্ষেত্রে একটি মোবাইল নম্বর ব্যবহার হচ্ছে। মুজিববর্ষ উদ্যাপনের প্রণোদনার আওতায় গৃহহীনকে গৃহদানের সুফল নিচ্ছে বড় রাজনীতিকের ‘চাচাতো ভাই’ ‘মামাতো ভাই’রা!

সরকার নাগরিকের সেবাপ্রাপ্তি নিশ্চিত করতে সেবা প্রদান ব্যবস্থায় জাতীয় পরিচয়পত্র আবশ্যক করার চিন্তা করছে মাত্র, আর দুর্বৃত্তরা খোদ নির্বাচন কমিশনে সম্পৃক্ত হয়ে কয়েক হাজার ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র ইতোমধ্যে বের করে ফেলেছে! পাঁচশ’ টাকায় মানুষের বাসাবাড়ি থেকে কোভিড-১৯ টেস্টের নমুনা সংগ্রহের ব্যবস্থা করা হয়েছে; কিন্তু নমুনা সংগ্রহকারীদের কেউ কেউ জীবনের ঝুঁকির দোহাই দিয়ে বকশিশসহ তা দাবি করছেন চার হাজার টাকা।

২০০৫-০৬ অর্থবছরে প্রতিবন্ধী ভাতা কর্মসূচি চালু হলেও একাধিক প্রতিবন্ধীর পরিবারে এযাবৎ ভাতা না পৌঁছার সংবাদ হরহামেশা গণমাধ্যমে আসছে। বাংলাদেশ রেলওয়ের টিকিট বিক্রয় ব্যবস্থা ডিজিটাল করা হল; কিন্তু ঈদযাত্রার অনলাইন সব টিকিট যে কোন ভূতের পকেটে ঢোকে, তা আজও কেউ বের করতে পারল না। হাইস্পিডের ইন্টারনেট নিয়ে নির্ধারিত তারিখের প্রথম মিনিটে ওয়েবসাইটে প্রবেশ করলেও আপনাকে দেখানো হবে: ‘টিকিট সব বিক্রি হয়ে গেছে!’ এমন ডিজিটাল ব্যবস্থা দিয়ে কি অনিয়ম-দুর্নীতি রুখতে পেরেছি আমরা?

সরকারের উচ্চপর্যায়ে দুর্নীতি প্রতিরোধের প্রয়াসে আন্তরিকতার অভাব নেই। বারবারই সরকারপ্রধান সেটি উচ্চারণ করছেন। কিন্তু যাদের দ্বারা তার এ স্বপ্নের বাস্তবায়ন ঘটবে, তাদের কানে তার সেই কথা ঢুকলে তো! এ জন্যই পরিবহন খাতে নৈরাজ্য ঠেকাতে জেলা প্রশাসকদের সম্মেলনে সড়ক পরিবহন মন্ত্রীকে বলতে শুনি: ‘আমি রুলিং পার্টির সেক্রেটারি বলছি, কেউ কথা না শুনলে সরাসরি আমাকে জানাবেন।’ এতেও কোনো সুফল মেলার নজির নেই।

বিআরটিএ ডিজিটালাইজড হল বটে; কিন্তু গাড়ির ফিটনেস সার্টিফিকেট ও ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রাপ্তিতে ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ কমল কই?

এ জন্য সরকারি সেবা প্রদানের প্রতিটি ডিজিটালাইজড মাধ্যমেই দুর্নীতি বা অনিয়ম প্রতিরোধের ব্যবস্থা রাখতে হবে। সরকারি প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট এখনও একপাক্ষিক যোগাযোগ মাধ্যম।

সেগুলো নতুন-পুরনো কিছু মিশেল তথ্য বিতরণ করে, কর্মকর্তাদের বিদেশ গমনের অনুমতিপত্র ওয়েবসাইটে ঝুলিয়ে রাখে; যা আপামর জনগণের কোনো কাজে লাগে না। জনগণ ওয়েবসাইট থেকে প্রতিটি সেবার মূল্যমান, নির্ধারিত সময় ও প্রক্রিয়া জানতে চায়। দুর্নীতি-অনিময়, সেবাপ্রাপ্তিতে নিজেদের হতাশা-অভিযোগ জানাতে চায়। এ জন্য ওয়েবসাইটগুলোকে পোর্টালে পরিণত করতে হবে, যেখানে সেবাপ্রত্যাশী নাগরিক তার মতামত তুলে ধরতে পারেন।

জনগণ ডিজিটাল পদ্ধতিতে সেবা গ্রহণে প্রস্তুত। তবে সেবাপ্রদানে দায়িত্বপ্রাপ্তদের আচরণেও পরিবর্তন আনতে হবে। গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীটিও আজ মোবাইল ব্যাংকিং বোঝে; কিন্তু উপবৃত্তির অর্থ প্রদানকালে স্কুল কর্তৃপক্ষ অন্যায্য অজুহাতে কেন তার প্রাপ্য অর্থের একটি অংশ কর্তন করে- সেটি তার মাথায় ঢোকে না। তাই সরাসরি প্রকৃত উপকারভোগীর কাছে প্রণোদনা পৌঁছাতে নামের তালিকা সংগ্রহ ও বিতরণ পদ্ধতিতেই এমন ব্যবস্থা রাখতে হবে, যেন কোনো মধ্যস্বত্বভোগী ফায়দা লুটতে না পারে।

স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী যেখানে তার ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বর জনগণের জন্য উন্মুক্ত করেন, সেখানে সরকারি প্রতিষ্ঠানে তথ্য প্রদানের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ সংক্রান্ত তথ্য প্রদর্শন না করাটা এক ধৃষ্টতাই বটে।

সরকারি সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা গুনে শেষ করা যাবে না; কিন্তু সেবা প্রদান সংক্রান্ত হটলাইন নম্বর রয়েছে কটি? ৯৯৯, ১০৬ বা ৩৩৩-এর মতো জনপ্রিয় এ নম্বরগুলোর কার্যকারিতা সে দাবিকেই জোরালো করে। একইসঙ্গে এ ধরনের ব্যবস্থায় দুর্নীতি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার সংযোজন নিঃসন্দেহে কাঙ্ক্ষিত দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ বিনির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।


হোজ্জাতুল ইসলাম

দুর্নীতিবিরোধী সামাজিক আন্দোলনের কর্মী, ধানমণ্ডি, ঢাকা

hozzatul-gmail.com

No comments