Breaking News

উদ্যোক্তা দম্পতির সফলতার গল্প


দেশের একটি বড় অংশের নারীর কাছে ঈদ মানেই লীজান মেহেদি। এ পণ্যের মূল প্রতিষ্ঠান লীজান গ্রুপ প্রতিষ্ঠার ২৫ বছর পেরিয়ে ২৬ বছরে পা রেখেছে সম্প্রতি। নাজমুল হক ও তানিয়া হক দম্পতি প্রতিষ্ঠানটি তিলে তিলে গড়ে তুলেছেন। তাদের সঙ্গে কথা বলে বিস্তারিত জানাচ্ছেন বেনজির আবরার—


তাদের উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে জানিয়েছেন ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাজমুল হক ও চেয়ারম্যান তানিয়া হক। প্রথম প্রশ্নটি ছিল নাজমুল হকের কাছে, ‘স্বপ্নটা কবে থেকে দেখতে শুরু করেছেন?’ দারুণ কথা বলতে পারা মানুষটি জানালেন, ‘আমাদের স্বপ্নগুলো এক করে আমরা লীজানের যাত্রা শুরু করি ২৫ বছর আগে। আমরা চেয়েছিলাম এমন কিছু করবো, যাতে মানুষের উপকারের পাশাপাশি নিজেরাও ব্যবসায়ে সফল হতে পারি।’

আলোচনায় যোগ দিলেন তানিয়া হক। তিনি বলেন, ‘উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্নটা আমাকে নাড়া দিয়েছিল যখন আমি ক্লাস সিক্স কিংবা সেভেনে পড়ি তখন। কেন নাড়া দিয়েছিল আমি ঠিক জানি না। তবে তখন থেকেই অর্থ খরচ না করে আমি জমাতে পছন্দ করতাম। খুব ছোট একটা শান্ত স্বভাবের মানুষ ছিলাম, কম কথা বলতাম। কিন্তু চিন্তা করতাম, কিভাবে টাকা-পয়সা থেকে আরও টাকা-পয়সা বাড়ানো যায়। ছোটবেলায় এই স্বপ্ন ছিল। উদ্যোক্তাই যে হবো; তখন এরকম স্বপ্ন দেখতাম, তা নয়। কখনো মনে হতো অভিনেত্রী হই, কখনো মনে হতো এয়ার হোস্টেজ হবো, আবার আমার ব্যারিস্টার হওয়ারও স্বপ্ন ছিল।’


তিনি বলেন, ‘এসএসসির পর উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্নটাকে একেবারে শক্ত করে আঁকড়ে ধরেছি। আমার খুব মজার একটা গল্প আছে। আমার দেশের বাড়ি পাবনা, আমি তখন ইন্টারমিডিয়েট পড়ছি। মাঝে মাঝেই আমি সেখান থেকে ২০-৩০টা পাবনার বিখ্যাত তাঁতের শাড়ি ঢাকায় এনে বিভিন্ন মার্কেটে বিক্রি করতাম। তখন একেকটা শাড়ি থেকে আমার ২০০ টাকা করে লাভ হতো। আমার দিব্যি চলে যেত তা দিয়ে। আমি আমার বিলাসিতার অনেক কিছু করতাম ওই টাকা দিয়ে। পাশাপাশি যখন ইডেনে ডিগ্রি পড়ি; তখন বিভিন্ন কোচিং সেন্টারে টিচার হিসেবে জয়েন করি। প্রতি ক্লাসে ১০০ টাকা করে পেতাম।’

তানিয়া আরও যুক্ত করেন, ‘আমার এখনো মনে আছে, প্রতিদিন ২-৩টা করে ক্লাস নিতাম। সেখানে আমার প্রতিদিন ৩০০ টাকা ইনকাম হতো। ওই সময় কিন্তু এই ৩০০ টাকা অনেক। এই চিন্তা আমার মাথায় তখনই ছিল। এর কারণ কিন্তু এটা না যে, আমার বাবা-মা আমাকে বলেছে তুমি উপার্জন করো। আমার বাবা একজন ইঞ্জিনিয়ার, তিনি সব সময়ই চাইতেন আমি যেন শুধু পড়াশোনা করি। তার স্বপ্ন এখনো ওই এক জায়গায়ই আটকে আছে। তিনি এখনো আমার সন্তানদের পড়াশোনার ব্যাপারে আমাকে প্রেসার দিতে থাকেন। তবে পড়াশোনার পাশাপাশি কাজকে আমি অনেক বেশি গুরুত্ব দেই। আমি মনে করি, পড়াশোনা করার পর কেউ যদি কাজে না আসেন। তাহলে অনেক সময় ডিপ্রেশনে চলে যান। তাই পড়াশোনাকে পাশে রেখে বিভিন্ন অ্যাক্টিভিটিজ চালানো যায়, তা বিশ্বাস করি।’

আড্ডা যখন জমে উঠছিল; তখন একটি প্রশ্নে দারুণ উত্তর মেলে। প্রশ্নটি ছিল—‘একজন উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য কোন গুণটা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন?’ এমন প্রশ্নের জবাবে নাজমুল হক বলেন, ‘আমি বলব, সবচেয়ে বেশি যে জিনিসটা প্রয়োজন তা হলো, সে কোন কাজটা করতে বেশি পছন্দ করে। কারণ অনেকেই ডাক্তারি পড়া শেষ করে ডাক্তারি পেশা ছেড়ে অন্য কিছু করছে। আমরা এরকম অনেক দেখেছি যে, অনেকে পাইলট থেকে নায়ক হয়েছেন, মডেলিং করে সফল হয়েছেন। আমি মনে করি, তিনি কী করতে পছন্দ করেন; সেটা তার সবচেয়ে আগে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। তারপর সেই কাজে হাত দেওয়া উচিত। সেক্ষেত্রে ইচ্ছাশক্তি খুব প্রয়োজন। ইচ্ছাশক্তি থাকলে যেকোনো কাজ করা সম্ভব।’


‘যারা লীজান গ্রুপে চাকরি করতে ইচ্ছুক; তাদের মধ্যে কোন গুণগুলো আপনারা দেখতে চান?’ এমন প্রশ্নের উত্তরে তানিয়া হক বলেন, ‘আমি তাদের স্বপ্নটাকে আমার ভেতরে আগে ধারণ করতে চাই। তাদের স্বপ্নটা আসলে সত্যিকারের স্বপ্ন কি-না, তা বুঝতে চাই। তাদের আসলে কতখানি উপরে ওঠা সম্বন্ধে ধারণা আছে, জানতে চাই। অনেকের ধারণাই নেই, কতটুকু পর্যন্ত ওঠা যায়। যখন আমরা ইন্টারভিউ নেই, তার ওঠা নিয়ে কোনো স্বপ্ন নেই। শুধু সে একটা চাকরি পাওয়ার জন্য উদগ্রীব। আর একটি কথা প্রায়ই শুনতে হয়, ‘আমি সব কিছু পারবো, সব কিছু পারবো—ইনশা আল্লাহ। একটা দিয়েই দেখেন’। কিন্তু কী পারবেন না পারবেন, তার চাকরির সর্বোচ্চ র্যাংক কি সেটাই তিনি জানেন না। আমি আসলে যে জিনিসটা বিশ্বাস করি, একজন তরুণের জানা উচিত সর্বোচ্চ কোন জায়গা পর্যন্ত যাওয়া যেতে পারে। সর্বোচ্চ কতখানি পরিশ্রম করা যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে তরুণদের বলবো, যারা অনেক কাজ করছেন, কাজের পাশাপাশি বিশ্রামও নেবেন; এটা প্রয়োজন। তাদের অনেক গুণের মধ্যে আমি সততা দেখতে চাই, পরিশ্রম দেখতে চাই, ইচ্ছাশক্তিটা দেখতে চাই।’


দু’জনের মতামত ঠিক মিলে যাচ্ছিল দেখে একটি প্রশ্ন উঠে এলো, ‘উদ্যোক্তাদের নিয়ে কী কী স্বপ্ন দেখেন?’ জবাবে নাজমুল হক বলেন, ‘সত্যি কথা বলতে গেলে, ২৬ বছর আগে তখন এক বা দুই জনের কর্মসংস্থান দিয়ে শুরু করেছিলাম। এখন আমার কাছে মনে হয়, সেই স্বপ্নের সঙ্গে এখনকার স্বপ্নের কোনো মিল নেই। অবশ্যই এখন হাজার হাজার লোকের কর্মসংস্থানের কথা ভাবি। তাদের পরিবার যেন খুব ভালোভাবে চালাতে পারেন, সেটা ভাবি। তারা যেন চিন্তামুক্ত থাকেন, স্বাবলম্বী হন, সুন্দর পরিবেশে যেন তাদের সন্তানদের মানুষ করতে পারেন।’


একই প্রসঙ্গে তানিয়া হক বলেন, ‘সেইসঙ্গে আমি আরেকটি কথা ভাবি, আরও বেশি উদ্যোক্তার প্রয়োজন আমাদের দেশে। বিগত ৫ বছর আমাদের দেশের অনেক উদ্যোক্তা, বিশেষ করে নারী উদ্যোক্তাদের সাথে বিভিন্ন প্রোগ্রামে আমার দেখা হয়েছে। এখন আমার যেই স্বপ্নটা কাজ করে, তারা প্রত্যেকেই ছোট ছোট করে শুরু করুক। ঘরে ঘরে একেকজন উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখুক। ধীরে ধীরে বড় বড় উদ্যোক্তা হলে একসময় আমাদের দেশ এত বেশি স্বনির্ভর হবে যে, আমাদের আর পেছনে ফিরে তাকাতে হবে না।’ [খবর: জাগো নিউজ ২৪]

No comments